মোঃ রেজাউল করিম আলম, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধিঃ ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিনে পঞ্চগড়ের করোতোয়া নদীর আউলিয়া ঘাটে নৌকাডুবিতে নিহত সনাতন ধর্মাবলম্বী ভুপেন্দ্রনাথ ও রুপালী রানীর শিশু সন্তান দিপুর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী। ২৬ শে জুলাই রোজ বুধবার দুপুরে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জেলা জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক জনসভায় এই ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৫ মাস জেল খাটার পর আমি প্রথমে পঞ্চগড় সফর করি। এ সময় আমি এই শিশুটির বাড়িতে গিয়ে তাদের দায়িত্ব নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেই। কিন্তু আমি দেখলাম, আমরা যাবার পরের দিন এই এলাকার তৎকালীন সংসদ সদস্য ও তার স্ত্রী গিয়েছেন। তারা গিয়ে বলেছেন যে এই বাচ্চার দায়িত্ব তারা নেবেন। ভালো, খুশি হলাম। যাক, তাদের অভিভাবক পাওয়া গেলো। পরে আমি এই শিশুদের প্রতিবেশিদের জিজ্ঞেস করলাম, যারা তাদের দায়িত্ব নিয়েছিলো তারা কি প্রতিমাসে খবর নেয়? তারা বলে, না, খবর নেয়নি। তারা কি কিছু দিয়েছে? তারা আমাকে বলল, শুধু কাপড়-চোপড় দিয়েছে। শুধু কাপড়-চোপড় দিলে হবে না। তাদের লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া দেবে কে? আজকে তাকে কোলে নেয়ার সুযোগ হলো। এই দিপু যতোদিন পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক না হবে, ততোদিন পর্যন্ত তার সকল দায়িত্ব আমাদের। প্রতি মাসের ১ তারিখে আমরা তার বাড়িতে পৌঁছে যাবো।
তিনি আরও বলেন, আমরা এই দেশে মেজরিটি-মাইনরিটি মানি না। আমরা মানবতাকে টুকরা টুকরা দেখতে চাই না এই দেশে সবাই মিলেমিশে থাকতে চাই সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু বলে কিছু নেই এই দেশে যে জন্ম নিয়েছে, এই দেশের গর্বিত নাগরিক। আমরা নাগরিকদের ভাগ বাটোয়ারা কোনো ধর্ম বা দলের ভিত্তিতে গড়ার পক্ষে নই। এই বোধহয় অতীতের পতিত স্বৈরাচারের ছিল। তারা এই জাতিকে ভেঙে টুকরা টুকরা করে মুখোমুখি লাগিয়ে রেখেছিলো। যে দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে না, সে দেশের মানুষ মাথা সোজা করে সম্মানের সাথে দাঁড়াতে পারে না। স্বাধীনতার ৫৪ বছর গেলো, আর কতো বছর আমাদেরকে এভাবে টুকরা টুকরা করে রাখা হবে? আমাদের স্পষ্ট ঘোষণা, আমরা কোনো মেজরিটি-মাইনরিটি মানি না। আমরা আমাদের প্রতিবেশিকে কষ্ট দিতে চাই না। তবে আমাদের প্রতিবেশিও যেন আমাদের উপর এমন কোনো কিছু চাপিয়ে না দেন, যা বাংলাদেশের মানুষের জন্য সম্মানজনক নয়, অপমানজনক। যদি এ রকম কিছু তারা করেন, তাহলে দেশের স্বার্থে ভূমিকা পালন করতে আমরা কারও চোখের দিকে তাকাবো না।
তিনি আরও বলেন, আমরা বাংলাদেশ কে একটি মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমরা বাংলাদেশ কে আর গডফাদারের দেশ, গডমাদারের দেশ, মাফিয়াতন্ত্রের দেশ বা ফ্যাসিবাদের দেশ দেখতে চাই না। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যারা ফ্যাসিবাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদেরকে আমরা স্মরণ করছি।
যুবকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জেগে উঠতে হবে। আমরা আপনাদের সাথে আছি। মানুষের মুক্তির মিছিলে আমি পিছিয়ে থাকবো না, ইনশাআল্লাহ আমি তোমাদের সামনে থাকবো। আমাদের কে কেউ কেউ এখনো মাঝে মাঝে ভয় দেখান, ধিক্কার দেখান। তারা বলে, এই হলে ওই হলে আবার আপনাদের ফাঁসি হবে। আরে ভাই, কারে ফাঁসির ভয় দেখান? যারা শহীদ হওয়ার জন্য উন্মুখ, যারা পাগল, তাদেরকে ফাঁসির ভয় দেখান? এই ভয় করলে আমাদের নেতৃবৃন্দ কে ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড়াতে হতো না, পাটাতনের উপর দাঁড়াতে হতো না এবং ফাঁসির রশি গলায় নিতে হতো না। তারা হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে গেছে। সুতরাং আমাদেরকে ভয় দেখাবেন না।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আল্লাহ যদি এই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব আমাদের হাতে দেয়, আমরা তোমাদেরকে এমন শিক্ষায় গড়ে তোলার চেষ্টা করবো, যেখানে তোমরা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ভয় করবে এবং দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ কারিগরের হাত নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হবে। একদিনের জন্যও বেকারত্বের অভিশাপ নিতে হবে না। শিক্ষার সার্টিফিকেট আসবে হাতে, সেই সাথে কাজের অফার লেটারও আসবে।
নারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সমাজের উন্নয়নে সব জায়গায় ইনশাআল্লাহ গর্বের সাথে আপনারা ভূমিকা রাখবেন। যে দুটি জিনিস এখন পান না, সেই দুটি জিনিসও পাবেন। একটি হচ্ছে মর্যাদা, আরেকটি হচ্ছে নিরাপত্তা। এই মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে আপনারা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবেন ইনশাআল্লাহ।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-র সভাপতি তাসমিয়া প্রধান, জেলা খেলাফত মজলিসের সভাপতি মীর মুরসেদ তুহিন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক ফজলে রাব্বি প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন।